চর্যাপদের সাধন তত্ত্ব সংক্ষেপে আলোচনা কর।
বাঙলা সাহিত্যের প্রাচীন যুগের একমাত্র নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক নিদর্শন হলো চর্যাপদ। চর্যাপদ মূলত বৌদ্ধ সহজিয়াদের সাধন সংগীত। বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যদের রচিত চর্যাপদগুলো সম্পর্কে ১৯০৭ সালের আগে কোন তথ্য জানা যায় নি। ১৯০৭ সালে মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী নেপালের রাজগ্রন্থাগার থেকে কতগুলো প্রাচীন কতগুলো পুঁথি আবিষ্কার করেন। ১৯১৬ সালে(১৩২৩ সনে) তার সম্পাদনায় বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ থেকে 'চর্যাচর্যবিনিশ্চয়', সরহপাদ ও কৃষ্ণাপাদের দোহা ও ডাকার্ণব - এই চারটি পুঁথি একত্রে ' হাজার বছরের পুরাণ বাংলা ভাষার বৌদ্ধগান ও দোহা' নামে গ্রন্থাগারে প্রকাশিত হয়।
এগুলোর মধ্যে চর্যাপদই একমাত্র বাংলা ভাষায় রচিত, অন্য তিনটি বাংলায় নয়, অপভ্রংশ ভাষায় রচিত। ড.সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় তার "Origin and Development of Bengali Language (ODBL)" নামক বিখ্যাত গ্রন্থে পদগুলোর ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করে দেখান, যে চর্যাপদ বাংলা ভাষায় রচিত সাহিত্যের আদিমতম নিদর্শন। চর্যাপদের প্রাপ্ত পুঁথিতে উল্লেখকৃত সংস্কৃত টীকার টীকাকার মুণিদত্ত।১৯৩৮ সালে প্রবোধচন্দ্র বাগচী কর্তৃক চর্যার তিব্বতি অনুবাদ প্রকাশিত হয়। আধুনিক পন্ডিতগণের অনুমান, প্রাচীন এই পুঁথিটির নাম ছিল 'চর্যাগীতিকোষ' এবং সংস্কৃত টীকার নাম 'চর্যাচর্যবিনিশ্চয়'।
চর্যাপদ হচ্ছে বৌদ্ধ সহজিয়াদের সাধন তত্ত্ববাদের বাহন। বৌদ্ধ ধর্মের তত্ত্বকথা চর্যাপদে বিধৃত হয়েছে । বৌদ্ধ সহজিয়া সাধকদের গুহ্য সাধন সংকেত রূপক প্রতীক ও চিত্রকল্পের মধ্য দিয়ে আভাসে ইঙ্গিতে প্রকাশিত হয়েছে। চর্যাপদের একটি বিশেষ সম্প্রদায় হলো সহজিয়া, যারা সহজ পথে সাধনা করেন। সহজ শব্দের অর্থ যা মানুষের স্বভাব পথের অনুকূল আর যা প্রতিকূল তাই বক্রপথ।
সহজিয়া পন্থীদের লক্ষ্য হলো মনুষ্য স্বভাবকে কোনোভাবে উপেক্ষা না করে বরং স্বভাবের মধ্য দিয়ে আত্মোপলব্ধির চেষ্টা করা।তাদের বিশ্বাস সাধনার লক্ষ্য যিনি , তিনি জ্ঞানস্বরূপ, তার অবস্থান দেহের মধ্যে , বাহিরে নয়। সুতরাং তারা মনে করেন দেহকে বাদ দিয়ে কোনো কিছু পাওয়া সম্ভব নয়। চর্যাপদগুলোতে সেই সহজিয়াপন্থীদের যে ধর্মসাধনার কথা বলা হয়েছে তা হলো মহাসুখ তত্ত্ব।
তারা উপলব্ধি করেছেন শাস্ত্র- আচার- অনুষ্ঠান পালন নিরর্থক। মন্ত্র - তন্ত্র, দেব-দেবীর মূর্তি পরিকল্পনা, পূজা -আচার - অনুষ্ঠানে তাদের বিশ্বাস ছিল না। গুরু নির্দেশিত গুহ্য পথ ধরে কায়া সাধনার ব্যক্তিগত মুক্তি ও সিদ্ধির প্রতিই তাদের বিশেষ দৃষ্টি ছিল। আশা নিরাশার দ্বন্দ্বে, আনন্দ বেদনার তালে তালে বহমান বাস্তব জীবনের জরা- মরণ ও পুনর্জন্মের বিষচক্র পেরিয়ে নির্বাণ লাভই বৌদ্ধ ধর্মের মূলমন্ত্র ছিল সহজিয়া সিদ্ধাচার্যগণ এই পথেরই পথিক।
তারা মনে করেন প্রত্যেক মানুষের দেবতা মানুষের দেহের মধ্যে বিরাজমান এবং তাকে উপলব্ধি করতে না পারলে মোক্ষলাভ করা যায় না। তবে মূল লক্ষ্যে পৌঁছাতে তারা নির্বাণ লাভের গূঢ় তান্ত্রিক আচার আচরণের কথা বলেছেন বিভিন্ন পদে । তবে কোনো কোনো পদে তত্ত্ব উপদেশ ও সাধনার ইঙ্গিত সম্পূর্ণভাবে গোপনীয় আছে বাহ্য অর্থের আবরণে। উদাহরণস্বরূপ লুইপাদ রচিত ১ নং পদে -
"কাআ তরুবর পাঞ্চ বি ডাল
চঞ্চল চীএ পইঠা কাল।।
দিঢ় করিঅ মহাসুহ পরিমাণ
লুই ভণই গুরু পুছিঅ জাণ।।"
লুইপাদ রচিত ১ নং পদে রূপকের মোড়কে সহজিয়া সাধনতত্ত্বের ব্যাখ্যা আছে । এ পদে শরীরকে গাছের সাথে তুলনা করে পঞ্চস্কন্ধ অর্থাৎ বাক্ পাণি,পাদ,পায়ু, উপাস্থ এই পাঁচটি কমেন্দ্রিয়কে গাছের শাখার সাথে তুলনা করেছেন । বিষয় বাসনায় চিত্ত চঞ্চল হয় বলেি আমরা সংসার জীবনে নানা দুঃখ ভোগ করে কাল অতিবাহিত করি।
কিন্তু এই চাঞ্চল্য দূর করে মহাসুখ লাভ করার জন্য চিত্তকে দৃঢ় করতে হবে, জাগতিক বা প্রকৃতি দোষমুক্ত হতে হবে । আর এই সাধনার পদ্ধতি জানতে গুরুর শরণাপন্ন হওয়া আবশ্যক । কারণ সহজিয়াদের সাধনা গুরুশিষ্য পরম্পরায় বিস্তৃত।
তত্ত্বের দিক থেকে বিচার করলে চর্যাগীতিগুলোতে দুটি বিষয় প্রাধান্য পেয়েছে । এক দর্শন তত্ত্ব আর একটি সাধন তত্ত্বের দিক। কিন্তু সাধন তত্ত্বের দিকই এখানে প্রধান হয়ে উঠেছে। চর্যাগীতিতে বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যদের ধর্মসাধনার প্রণালি প্রাধান্য পেয়েছে । সহজানপন্থী বৌদ্ধ ধর্মের সাধকদের সাধনার প্রক্রিয়ায় চর্যার বিষয়বস্তু ।
তিব্বতি ভাষায় এই বৌদ্ধ সাধককে বলা হয় সিদ্ধচার্য।তান্ত্রিক হটযোগ বা দেহসাধনার দ্বারাই সিদ্ধাচার্যরা জন্ম-মৃত্যু ও জাগতিক সুখ দুঃখের অতীত নির্বিকল্প সুখ উপভোগ করতে চান। দেহ সাধন , ত্রি- নাড়ীতত্ত্ব ও মহাসুখ লাভই চর্যার মূল কথা। তাই তারা দেহসাধনার মধ্য দিয়েই আরাধ্য দেবতাকে লাভ করতে চায়। তাদের মতে-
"উজুরে উজু ছাড়ি মা লেহুরে বঙ্ক।
নি আহি বহি মা জাহুরে লঙ্কা।। "(সরহপাদ-৩২)
অর্থাৎ সোজা পথ ছেড়ে বাঁকা পথে যেও না। নিকটেই বহি রয়েছে তার জন্য লঙ্কায় অর্থ ব্যয়করে দূরে যাওয়ার দরকার নেই।
গৌতম বুদ্ধের মৃত্যুর পর বৌদ্ধ ধর্ম মূলত ২ ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে - হীনযান ও মন্ত্রযান। মন্ত্রযান আবার দুইভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে - পারমিতযান ও মন্ত্রযান। এই মন্ত্রযান পরবর্তীকালে আরও অন্যান্য শাখার সঙ্গে যুক্ত হয়ে সহজযান এ রূপান্তরিত হয়।
'সহজ' কথাটির অর্থ যা জন্মের সাথে জাত হয়। কিন্তু সহজিয়া সাধকেরা এই অর্থে সন্তুষ্ট না থেকে তারা অর্থ করলেন স-হ-জ অর্থাৎ 'স' ও 'হ' এর মিলন জাত।তাদের মতে, স বর্ণটির অর্থ হলো সমতা জ্ঞান বা প্রজ্ঞা আর হ বর্ণটির অর্থ হলো বজ্রধর বা উপায় ।
এদের বিকল্প নাম হলো শূন্যতা ও করুণা। চর্যার পদগুলোতে এউ শব্দযুগলকে ধমন-চমন, ললনা,রসনা, নাদ-বিন্দু, আলিএ- কালিএ ইত্যাদি বিচিত্র নামে ব্যক্ত করা হয়েছে । এই শূন্যতা ও করুণাকে সাধনার দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করে নৈরাত্না দেবীর সাথে মিলিত হলেই মহাসুখ লাভ করা যায় ।
এই মহাসুখ,শূন্যতা, করুনার তত্ত্বকে সহজিয়া সাধকেরা দেহের বিভিন্ন কার্যকলাপ এর উপর স্থাপন করেছেন এবং সেজন্য দেহের মধ্যে চারটি চক্র বা পদ্মের অস্তিত্ব কল্পনা করেছেন । প্রথম চক্র নাভিতে অবস্থিত - এর নাম 'নির্মাণ চক্র', দ্বিতীয় চক্র হৃদয়ে -এর নাম 'ধর্মচক্র',তৃতীয় চক্র কণ্ঠে অবস্থিত - এর নাম সম্ভোগচক্র, চতুর্থ চক্র মস্তিষ্কে অবস্থিত-এর নাম সহজচক্র বা মহাসুখচক্র।
এই সহজচক্রেই বোধিচিত্তের স্বস্থান । দেহের চক্রাবস্থান ছাড়াও সহজিয়া সাধকেরা তিনটি প্রধান নাড়ীকে সাধনার সহায়রূপে গ্রহণ করেছেন । বাম নাসারন্ধ্র থেকে প্রবাহিত বামগা নাড়ী প্রজ্ঞা রূপিণী ইড়া এবং দক্ষিণ নাসারন্ধ্র থেকে প্রবাহিত দক্ষিণগা নাড়ী উপায় রূপিণী পিঙ্গলা। বৌদ্ধতন্ত্রে এগুলো হলো যথাক্রমে শূন্যতা ও করুণা।
এই দুই নাড়ীর অর্থ্যাৎ মেরুদন্ডেকর মাঝখান দিয়ে যে নাড়ী প্রবাহিত সেই মধ্যগা নাড়ীকে সুষুম্না নাড়ী বলে।কিন্তু বৌদ্ধতন্ত্রে এর নাম অবধূতিকা।চর্যাপদের বিভিন্ন পদে তাকে আমরা শুণ্ডিনী,চণ্ডালী, ডুম্বী ও নৈরামুণি নামে ও দেখতে পাই। এই মধ্যগা নাড়ী পথেই অদ্বয় বোধিচিত্তের সাধনা করতে হয়। সাধারণভাবে ইড়া ও পিঙ্গলা নাড়ীর গতি নিম্নমুখী। এই দুই নাড়ী সৃষ্টি ও সংহারের প্রতীক । সাধককে প্রথমে প্রকৃতিদোষ থেকে মুক্ত হয়ে যোগ বলে ইড়া ও পিঙ্গলা নাড়ীর নিম্নগতিকে রুদ্ধ করতে হয়।চাটিলপাদ এর ৭ নং পদে এই দুই নাড়ীকে নিয়ন্ত্রণে উপায় দেখতে পাই -
"ভব ণই গম্ভীর বেগেঁ বাহী।
দু অন্তে চিখিল মাঝেঁ ন থাহী।।
……………………………………………….
ফাড়িঅ মোহতরু পাটী জোড়িঅ।
অদঅ দিঢ়ি টাঙ্গি নিবাণে কোড়িঅ।।"
এপদে চাটিলপাদ বিশ্বসংসারকে নদীর সাথে তুলনা করেছেন। নদীর ঢেউয়ের উত্থান পতনের মতো মানুষের মনে জাগতিক বাসনা উত্থান পতন ঘটে। কলুষপূর্ণ এই ভবনদী রূপ প্রকৃতি দোষ মুক্ত হয়ে সেতু নির্মান অর্থাৎ ইড়া ও পিঙ্গলাকে নিয়ন্ত্রণের মধ্য দিয়ে নৈরাত্মা দেবীর সাথে মিলিত হওয়ার কথা বলেছেন।
এই দুই নাড়ীর ধারাকে মধ্যমার্গে একত্রিত করে ঊর্ধ্বগামী করতে হয়। প্রথমে নাড়ী দেশের নির্মাণ চক্রে বোধিচিত্তের উৎপন্ন হয়, তারপর ধর্মচক্রে, সেখান থেকে সম্ভোগচক্রে এবং সেখান থেকে মস্তিষ্কে অবস্থিত মহাসুখচক্রে প্রেরণ করলে বোধিচিত্ত সাংবৃত্তিক অবস্থা থেকে পরমার্থিক রূপ লাভ করে তখন সাধকের কাছে সহজানন্দ ধরা দেয়। বোধিচিত্তের চারটি চক্রের অবস্থিতি অনুযায়ী এই আনন্দ অনুভূতির স্তর চতুর্বিধ--
ক.আনন্দ
খ.পরমানন্দ
গ.বিরমানন্দ
ঘ.সহজানন্দ
স্তরগুলো অতিক্রম করে সহজানন্দে উপনীত হয়ে নৈরাত্মা দেবীর সাথে মিলিত হলেই মহাসুখ লাভ করা যায়।
চর্যাপদের ২৮ নং পদে শবরপাদ শবর- শবরীর প্রেম ও মিলনের মধ্য দিয়ে ও সহজানন্দ লাভের উপায় বলে দিচ্ছেন -
" উঞ্চা উঞ্চা পাবত তহি বসই সবরী বালী।
মোরাঙ্গ পীচ্ছ পরিহাণ সবরী গীবত গুঞ্জরী মালী।।
…………………..
তিঅ ধাউ খাট পড়িলা সবরো মহাসুহে সেজি ছাইলী।
সবরো ভুঅঙ্গ ণইরামণি দারী পেস্ম রাতি পোহাইলী।।"
লৌকিক জীবনের মায়ামোহ হতে মুক্ত হয়ে পরম সুখ লাভের উপায় বলেছেন । এখানে দেহটাকে সুমেরু পর্বতের সাথে তুলনা করেছেন যার মস্তিষ্ক একটা চূড়া। সেখানে নৈরাত্মা দেবীর বাস করে এখানে শবর হলো সাধক আর শবরী নৈরাত্মা দেবী।সাধক ত্রিধাতু কায় বাক্ চিত্তরূপ নির্মিত বোধিচিত্ত শূন্যতায় বিলীন করে বজ্রশক্তিধর সাধক শবর নৈরাত্মা দেবীর সাথে মিলিত হয়ে সহজানন্দ লাভ করে ।
মহাসুখ বা মন্ময় আনন্দ লাভের জন্য কোন সাধন পন্থা চর্য অর্থাৎ আচরণীয় এবং কোনটি অচর্য বা অনাচরণীয় তা বিনিশ্চয় বা সুনিশ্চিতরূপে নির্ণয় করা চর্যাগীতিগুলোর একমাত্র উদ্দেশ্য । তবে চর্যাপদ প্রধানত সহজিয়া মতের ওপর প্রতিষ্ঠিত হলে ও কিছু কিছু পদে বজ্রযানের সাধনার প্রসঙ্গটি ও এসেছে ।
কায়া সাধন তত্ত্ব।চর্যাপদ।বাংলা সাহিত্যের আদি নিদর্শন চর্যাপদ।চর্যাপদের সাহিত্য মূল্য আলোচনা কর।চর্যাপদের সামাজিক গুরুত্ব।চর্যাপদের সাধন তত্ত্ব সংক্ষেপে আলোচনা করো।চর্যাপদের সাধন তত্ত্ব pdf।চর্যাপদের সমাজ জীবনের পরিচয় দাও।চর্যাপদের ভাষা বাংলা কি না।চর্যাপদের সমাজচিত্র।

0 মন্তব্যসমূহ